আর এক নোবেল লরিয়েটের গল্প

Aug 18, 2026 - 23:00
 0  1
আর এক নোবেল লরিয়েটের গল্প

দেশ তখনও অবিভক্ত। লাহোরের সনাতন ধর্ম কলেজ। দেশভাগের পর যার স্থান হবে ভারতে। সেখানে অঙ্কের ক্লাস নিচ্ছেন প্রখ্যাত অধ্যাপক এ এন গাঙ্গুলি, পুরো নাম অনিলেন্দ্র নাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৮২)। এপ্লায়েড (ফলিত) ম্যাথামেটিক্সের দিকপাল। ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে লাহোরে অধ্যাপনা করছেন তিনি। হঠাৎই খেয়াল করলেন ক্লাসের এক ছাত্র, নোট না নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ছাত্রটি অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু খামখেয়ালীও, অঙ্কে বিশেষ উৎসাহী নয়। ভীষণ রেগে গেলেন প্রফেসর গাঙ্গুলি। "সালাম, কি দেখছো বাইরে? তোমার মনোযোগ কোথায়? অংকের ক্লাস যদি ভাল না লাগে তাহলে বসে আছো কেন? গেট আউট!" অমনোযোগী সেই ছাত্রটিকে সেদিন ক্লাস থেকে বকাবকি করে বের করে দিয়েছিলেন তার মাস্টারমশাই। কিন্তু ক্লাসের শেষে আবার তাকেই কাছে ডেকে নেন। ভালবেসে, অকৃত্রিম স্নেহে নতুন করে শেখাতে শুরু করেন অঙ্ক ও তার জাদু-সাম্রাজ্যের মাহাত্ম্য। এবার আর ছাত্রটি অমনোযোগী হয়নি। মাস্টারমশাইয়ের হাত ধরে সে তখন ডুব দিয়েছে ফলিত গণিতের অপার সমুদ্রে। বাকিটা ইতিহাস।

সাল ১৯৭৯। প্রায় চল্লিশ বছরের ব্যবধান। নোবেল পুরস্কার পেল সেই ছাত্র'টি। সারা বিশ্ব তখন তাকে চেনে ফিজিক্সের কিংবদন্তি ড. আবদুস সালাম নামে। পাকিস্তানের প্রথম নোবেল লরিয়েট। গোটা উপমহাদেশ উচ্ছ্বসিত তার কৃতিত্বে। 'ইলেক্ট্র-উইক ইউনিফিকেশন থিওরি' নিয়ে শেল্ডন গ্লাসগো এবং স্টিভেন ওয়েনবার্গের সঙ্গে নোবেল উঠেছে তারও হাতে। 'আহমেদিয়া' সম্প্রদায়ভুক্ত ধর্মভীরু মুসলিম আবদুস সালাম শেরওয়ানি, পাগড়ি পরে স্টকহোমে হাজির হয়েছিলেন, গ্রহন করেছিলেন সেই সম্মান। স্বগত ভাষণে শুধু ফিজিক্স বা অংক বা গবেষণার বিষয়ই নয়, শ্রদ্ধাপূর্ণ চিত্তে স্মরণ করেছিলেন তার সেই মাস্টারমশাই'র কথা, তার অবদানের কথা। একদিন যার ক্লাসে মন না বসানোর জন্য তাকে বকাঝকা শুনতে হয়েছিল। সেই ছাত্র সেদিন অশ্রুসিক্ত চোখে স্মরণ করেছিল তার বাঙালি মাস্টারমশাইকে।

ফিজিক্স ও অংকের মহাপণ্ডিত, পাকিস্তানের প্রথম 'নোবেল লরিয়েট' ও আধুনিক পাকিস্তানে বিজ্ঞান চর্চার পথিকৃৎ, বিজ্ঞানী ড. মহম্মদ আবদুস সালাম (১৯২৬-১৯৯৬) ও তার বাঙালি মাস্টারমশাই অনিলেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির সেই গল্প রূপকথা'কেও হার মানায়। অথচ, ইতিহাস মনে রাখেনি তাদের। ১৯৭৯ সালে নোবেল জয়ের পর সম্বর্ধনা জানাতে ড. সালামকে ভারতে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সালাম শুধু একটাই আর্জি রেখেছিলেন - "আমার মাস্টারমশাই'কে খুঁজে দিন!" তাই করে ছিলেন ইন্দিরা। অকৃতদার অধ্যাপক গাঙ্গুলি তখন কলকাতায়, প্রবল অসুস্থ, শেষের দিন গুনছেন। আজীবন ছাত্র পড়িয়ে আসা অধ্যাপক গাঙ্গুলি শেষ জীবন শিক্ষকতা করে এসেছেন। দেশভাগের পরও তা জারি ছিল। ১৯৫৪ সালে অবসর নিয়ে দিনরাত গণিতচর্চায় ডুবে থাকতেন তিনি। কিন্তু কেউ মনে রাখেনি তাকে। কেউ জানতও না যে তারই ছাত্র নোবেল সম্মানে ভূষিত হয়েছে।

সেই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে ড. সালাম'কে দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী সম্মাননায় ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন ড. সালাম। তিনি বলেন, তার মাস্টারমশাই অধ্যাপক গাঙ্গুলিকে কোনদিন যথাযথ সম্মান দেয়া হয়নি। তাই তাকে যদি কোন সম্মান দেয়া হয়, তবেই তিনি কলকাতা আসবেন পুরস্কার গ্রহন করতে। আব্দুস সালামের এই প্রস্তাবে শোরগোল পড়ে যায় সর্বত্র। ছাত্রকে সম্মান জানানোর আগে তার প্রবাদপ্রতিম শিক্ষককে সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৮১ সালে কলকাতায় আসেন সালাম। উপস্থিত হন তার সেই মাস্টারমশাইয়ের দক্ষিন কলকাতার বাড়িতে। জুতে খুলে ঘরে ঢুকে সাট্টাঙ্গে শুয়ে পড়ে প্রনাম জানান সালাম। তারপর তার নোবেল পদক তুলে দেন শয্যাশায়ী অনিলেন্দ্রবাবুর হাতে। হাত ধরে জানান- "আপনার জন্যই এই সম্মান। আপনি এর যোগ্য। এই পুরস্কার আপনার।" অনিলেন্দ্রবাবু সেদিন কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাননি। শুধু প্রিয় ছাত্রের হাত দুখানি নিজের বুকের উপর টেনে নিয়েছিলেন। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল আনন্দাশ্রু। নীরবে জানিয়েছিলেন আশীর্বাদ। এর কিছুদিন পর ১৯৮২ সালে প্রয়াত হন অনিলবাবু। এর চোদ্দ বছর পর ১৯৯৬ সালে সত্তর বছর বয়সে অক্সফোর্ডে প্রয়াত হন ড. আবদুস সালাম। আজও পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশে রাবওয়ায় বহিস্তি মকবরার গোরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত তিনি। দুর্ভাগ্যের বিষয় 'আহমেদিয়া' সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার জন্য তাকে কখনো মুসলিম বলে স্বীকৃতি দেয়নি তার দেশ। তার সমাধি সৌধে 'পাকিস্তানের প্রথম মুসলিম নোবেল বিজেতা' বর্ণনা থেকে 'মুসলিম' শব্দটিকে সরিয়ে দেয়া হয়। অথচ আজীবন নিজেকে ধর্মভীরু মুসলিম ও পাকিস্তানি বলেই মনে করে এসেছেন সালাম। শেষ জীবন পর্যন্ত তাই পালন করে এসেছেন তিনি। যদিও বিজ্ঞান, মনন ও শিক্ষা কোন ধর্মের অনুগত নয়, এমনটি ছিল তার বিশ্বাস।

ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রেই আত্মবিস্মৃত। আমরা যেন সেই বিস্মৃতি কাটিয়ে উঠতে পারি।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0