বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি: প্রেক্ষাপট প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য

Aug 11, 2026 - 16:04
 0  2
বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি: প্রেক্ষাপট প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য

আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে স্বাধীনতা-উত্তর ও পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে আহমদ রফিকের প্রবন্ধটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। আমাদের বহু মূল্যবান লেখা শুধু মুদ্রণের পাতায় রয়ে গেছে; তেমনি একটি এই ‘বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি: প্রেক্ষাপট প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য’। তবে দীর্ঘদিন কেবল ছাপার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকা এই লেখা বিজয়ের মাসে অনলাইনে উঠে এল নতুন পাঠকদের সামনে।

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনলাইনপূর্ব যুগে যত লেখা, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ ও কবিতা ছাপা হয়েছিল, বিজয়ের পুরো মাসজুড়ে সেসব ধুলোঝরা পৃষ্ঠা আমরা প্রথমবারের মতো অনলাইনে তুলে আনছি।

চর্যাগীতির ভাষাকে যদি আদি বাংলা হিসেবে গণ্য করা যায় তাহলে বলা চলে, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দোঁহা রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরু। ভাষাতত্ত্বের মতে, ‘চর্যার ভাষার সঙ্গে মৈথিলী, ওড়িয়া ও অসমীয়া ভাষার কিছু সম্পর্ক আছে।’ চর্যাপদের রচনাকাল অষ্টম শতক থেকে শুরু, যদিও এ সম্পর্কে ভিন্নমত রয়েছে। কাল বিচারে তাই আদি বাংলা কাব্যগীতি ইংরেজি, ফরাসি বা জার্মান আদি কাব্য থেকে পিছিয়ে নেই। চর্যাগীতির চরিত্র বিচারে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে চর্যার ভাষা যেমন লৌকিক, তেমনি তাতে রয়েছে বাঙালি জনজীবনের প্রতিফলন, এর অন্তর্নিহিত মানবিক আবেদনও অনস্বীকার্য। আর চর্যাগীতির রচয়িতাদের অধিকাংশই যে ছিলেন নিম্নবর্গীয় শ্রেণির অন্তর্গত, এ তথ্যের তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ।

চর্যাগীতির উর্বরকাল পেরিয়ে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ও পদাবলি সাহিত্যে লৌকিক চেতনার পাশাপাশি মানবিক চেতনার প্রকাশও সত্য। পরবর্তী পর্যায়ে ধর্মীয় কাহিনি, পুরাণকথা এবং অনুরূপ কাহিনি কাব্যে সমন্বয়ের মানসিকতা স্পষ্ট, যেমন স্পষ্ট লৌকিক ধর্মবিযুক্ত প্রেমকাহিনিতে মানবিক চেতনার আভাস। এ যুগের সাহিত্য প্রচেষ্টা হিন্দু-মুসলমান কবিদের অবদানে সমৃদ্ধ। বাংলার বাউলসাধনা পূর্বোক্ত মরমিয়া, সহজিয়া ধারার পরিমুক্ত রূপ, যা সামাজিক ধর্মসাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মনের মানুষ খুঁজে ফেরার আকুতি নিয়ে গানের তানে সুরে-স্বরে পরিস্ফুট। তাদের মিলন সাধনা যেমন পরমের সঙ্গে তেমনি মানুষে-মানুষে।

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য আধুনিকতায় উদ্বুদ্ধ ধর্মসামাজিক নবজাগরণের মধ্যেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক কারণে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদী চেতনার পাশাপাশি মানবিক চেতনার ধারাও প্রকাশ পায়, যদিও প্রথমটি ছিল অধিকতর শক্তিমান। সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তখন একই সঙ্গে বিভাজিত সম্প্রদায়-চেতনার প্রতিফলন ঘটে। বিশ শতকের প্রথম দিকে সাহিত্যে আধুনিকতার চরিত্রবদল সত্ত্বেও ওই বিভাজন-চেতনা মুছে যায়নি। তবু পূর্বোক্ত ধারাবাহিকতায় সমন্বয়বাদী মানসিকতা সমাজের একাংশে রাজনীতি-সংস্কৃতির চর্চায় প্রকাশ পেয়েছে।

তা না হলে প্রথম বঙ্গবিভাগ (১৬ অক্টোবর, ১৯০৫) পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান উচ্চ ও মধ্য শ্রেণির আর্থসামাজিক স্বার্থের অনুকূল হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান সমাজের কিছুসংখ্যক বিশিষ্ট রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল হালিম গজনভি, ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, আবুল হুসেন, লিয়াকত হোসেন, আবুল কাসেম, দেদার বকস, দীন মহম্মদ, ডা. গফুর ইসমাইল, মহম্মদ ইউসুফ বা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখ বঙ্গবিভাগ রোধের প্রতিবাদে অংশ নেবেন কেন? হয়তো জাতিসত্তার বিভাজন তাঁরা চাননি।

এ বিষয়ে বিশদ আলোচনায় না গিয়েই বলা যায়, বঙ্গবিভাগের শাসনতান্ত্রিক ঘোষণার আগেই ১৯০৪ সালের ১৮ মার্চ কলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদী জনসভায় গৃহীত বঙ্গবিভাগ রোধের যে প্রস্তাব সরকারি দরবারে পাঠানো হয়, তাতে মুসলমান স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে নবাব সৈয়দ আমীর হোসেন, নবাব সৈয়দ আবদুস সোবহান, খান বাহাদুর, মোহাম্মদ ইউসুফ, মাওলানা শামসুল হুদা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

চর্যাপদের রচনাকাল অষ্টম শতক থেকে শুরু, যদিও এ সম্পর্কে ভিন্নমত রয়েছে। কাল বিচারে তাই আদি বাংলা কাব্যগীতি ইংরেজি, ফরাসি বা জার্মান আদি কাব্য থেকে পিছিয়ে নেই। চর্যাগীতির চরিত্র বিচারে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে চর্যার ভাষা যেমন লৌকিক, তেমনি তাতে রয়েছে বাঙালি জনজীবনের প্রতিফলন।

আরও উল্লেখ্য, ওই বছরই জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামে বঙ্গবিভাগবিরোধী জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জমিদার আনোয়ার আলী খান এবং বগুড়ায় অনুরূপ জনসভায় (২২ জুলাই, ১৯০৫) সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় ভূস্বামী সৈয়দ হাফিজুর রহমান চৌধুরী। সর্বোপরি বঙ্গবিভাগের দিন সমন্বিত জাতীয়তার প্রতীক হিসেবে ফেডারেশন হল নির্মাণ এবং স্বদেশি শিল্প ও শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘ন্যাশনাল ফান্ড’-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আবদুস সোবহান চৌধুরী, আবদুর রসুল, আবদুল হালিম গজনভি (অন্যতম সেক্রেটারি) প্রমুখ।

ওই বছরই (২৩ সেপ্টেম্বর) কলকাতার রাজপথে হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের বিশাল প্রতিবাদী মিছিল মনে করিয়ে দিতে পারে ঠিক চার দশক পর (১৯৪৫) নভেম্বরে ছাত্র-জনতার মহামিছিলে তিনদলীয় পতাকার ঐক্যবদ্ধ যাত্রা এবং ছিচল্লিশের ফেব্রুয়ারিতে রশীদ আলী দিবস উপলক্ষে অনুরূপ ঘটনা। কিন্তু সেই ঐক্যচেতনা ধরে রাখা বা এর প্রসার ঘটানো যায়নি। বিদেশি সরকারের বিভ্রান্তিকর প্রচার, ঢাকাই নবাব ও তাঁর সঙ্গীদের ভূমিকা এবং কৃষক বনাম জমিদার-মহাজনদের শ্রেণিসংঘাতের মতো প্রতিকূল ঘটনা, রক্ষণশীল মাওলানাদের সাম্প্রদায়িক প্রচার ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বদেশিদের বাস্তবিক ভুলভ্রান্তি ওই ব্যর্থতার কারণ। এত সব সত্ত্বেও তখনকার ঐক্যবোধের প্রতীকী প্রতিফলনই বোধ হয় ঘটে থাকবে বঙ্গবিভাগের স্বদেশি আবেগে রচিত রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ সাড়ে ছয় দশক পর স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার মধ্যে।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকারগণ চুলচেরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, কেন দেশের দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যকার রাজনৈতিক বিভেদ দূর হয়নি, কেন ভূখণ্ড বিভাগ রোধ করা যায়নি। সেসব ঐতিহাসিক সত্যের পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে বিভাজিত স্বতন্ত্র ভুবন তৎকালীন পূর্ববঙ্গে সাহিত্যচর্চায় পাকিস্তানি চেতনার প্রাথমিক আবেগ থিতিয়ে আসতে মোটেই সময় লাগেনি এবং সাহিত্য সৃষ্টির প্রধান ধারা ঐতিহ্যের অবদান হিসেবে রেখেই পথ চলেছে। তাই রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ থেকে তিরিশের বিশিষ্ট কবি ও কথাশিল্পীদের প্রভাব সাহিত্যচর্চায় নানাভাবে এসেছে। এমনকি চল্লিশের দামাল দশকে সৃষ্ট সমাজ প্রগতির সংরক্ত আবেগ অবস্থাবিশেষে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।

বিভাগোত্তর সাহিত্য

আসলে পাকিস্তান অর্জনের রাজনৈতিক আবেগ স্বাভাবিক নিয়মেই সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার প্রাথমিক দিনগুলোতে যথেষ্ট প্রভাব রাখে, যদিও তা হয়ে ওঠে স্বল্পকালীন। ওই আবেগের টানে শুরুতে পাকিস্তানি ভাবাদর্শে সাহিত্য রচনার চেষ্টা চলে, চলে ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে স্বাতন্ত্র্যবাদী জবরদস্তি। এ প্রচেষ্টায় সম্পন্ন ফসলের চেয়ে অপুষ্ট চিটা ফসলের পরিমাণ ছিল বেশি। অবশ্য একই সঙ্গে চলেছে ঐতিহ্যানুসারী ও প্রগতিবাদী সাহিত্যের ধীর পায়ে চলা। প্রধানত কবিতা এবং অংশত কথাসাহিত্যে ওই তৎপরতার প্রকাশ।

কিন্তু পাকিস্তানি রাজনীতির অনাচার ও শাসনতান্ত্রিক ভেদনীতির কারণে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাষা আন্দোলন বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতে এসে প্রচলিত ধারার অন্ধ অচলায়তন ভেঙে ফেলার কাজ সম্পন্ন করে। এর ফলে রাজনীতিতে যেমন গণতান্ত্রিক চেতনার যাত্রা শুরু তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায়, ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে, সর্বোপরি সাহিত্য সৃষ্টিতে আধুনিক চেতনার পথচলা শুরু। একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস তথা ভাষা দিবস পালনের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয় ‘একুশে সাহিত্য’ যেমন প্রায় দুই দশক পর আত্মশাসনের আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেরণায় সৃষ্টি ‘মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য’। দুই দশকের ব্যবধানে দুটো বাঁধভাঙা-বাঁকফেরার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতি, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির ক্ষেত্রে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটায়।

একুশে চেতনার আলোকিত পথে নতুন করে যে আত্মপরিচিতির (আইডেনটিটির) অন্বেষা শুরু, সে পথ ধরেই পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির ভাষিক জাতীয়তাবোধে উত্তরণ আর সেই ধারাবাহিকতায় উনসত্তরে গণ–আন্দোলন, সত্তরে জাতীয়তাবাদের এককাট্টা বিজয় এবং তা রক্ষায় একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধ জাতীয় জীবনের জন্য সত্য হয়ে ওঠে। মধ্যবর্তী সময় রাজনীতির অগ্রপশ্চাৎ টানাপোড়েনে বিদ্ধ। বায়ান্ন থেকে একাত্তর রাজনীতির প্রাধান্য এতটাই তীব্র ও ব্যাপক হয়ে ওঠে যে এর প্রভাব পড়ে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে। সাহিত্যে বিষয়গত দিকটা বড় হয়ে ওঠে, প্রকরণগত পরিচর্যা পিছিয়ে পড়ে। অবশ্য ষাটের দশকের প্রথম দিকে রাজনৈতিক পিছুটানের সময়পর্বে দেখা যায় প্রকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝোঁক, কবিতায় ও কথাসাহিত্যে। মননপ্রাধান্য ও জৈবযন্ত্রণার ব্যবচ্ছেদ আধুনিকতার সমার্থক হয়ে ওঠে।

কিন্তু ষাটের দশকের শেষ দিকে অবস্থা পাল্টে যায়। গণ–আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে কবি-লেখক হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা, কলম হয়ে ওঠে হাতিয়ার। কবিতার চিত্রকল্পে, প্রতীকে একুশের শিমুল-পলাশ-কৃষ্ণচূড়া রঙের ব্যবহার তখন কবিদের অতীব প্রিয়, লেখকদের জন্যও প্রিয় অনুষঙ্গ। এভাবেই জাতি পৌঁছে যায় একাত্তরের রণাঙ্গনে। গুলি-বারুদ ও রক্তের আবহ মানুষের মনে এমনি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি জাতি-জাতীয়তার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়। তরুণ কবির আবেগধৃত পঙ্‌ক্তি ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়ে যায়।

একুশে চেতনার আলোকিত পথে নতুন করে যে আত্মপরিচিতির অন্বেষা শুরু, সে পথ ধরেই পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির ভাষিক জাতীয়তাবোধে উত্তরণ আর সেই ধারাবাহিকতায় উনসত্তরে গণ–আন্দোলন, সত্তরে জাতীয়তাবাদের এককাট্টা বিজয় এবং তা রক্ষায় একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধ জাতীয় জীবনের জন্য সত্য হয়ে ওঠে।

বাস্তবেও দেখা যায় তরুণ কবি-লেখকদের হাতে কলমের বদলে স্টেনগান। তখন তাঁরা যোদ্ধা। অন্যদিকে নবীন-প্রবীণ সবার কলমে মাতৃভাষার আবেগ স্বাধীন মাতৃভূতির আকাঙ্ক্ষায় পৌঁছে যায়। নিজ বাসভূমে পরবাসী হওয়ার যন্ত্রণা লেখক-শিল্পীদেরও কুরে কুরে খায়। যুদ্ধের পটভূমিতে দুঃসময়ের ছবি আঁকেন কবি-কথাসাহিত্যিক সবাই। সবকিছু একই আবেগে সৃষ্টি, সব সৃষ্টি মিলে যেন একটা বিশালায়তন ক্যানভাসের রূপ নেয়। শহর-নগর-বন্দর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত গোটা দেশই যেন রণক্ষেত্র। আক্রান্ত নিসর্গ, আক্রান্ত মানুষ-নর-নারী-শিশু। এ অবস্থায় তরুণ কবির প্রতিক্রিয়া : ‘ধলপাড়া জেগে ওঠে কিশোরীর ভয়ার্ত চিৎকারে।’

এ জেগে ওঠার পরিণামে প্রতিরোধ ও সংঘাত সর্বজনীন রূপ গ্রহণ করে। বাউল মাটির মমতামাখা স্বদেশের জন্য স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়। ‘নদীর বুকে হাসন-লালনের একতারার গভীর আকুতি’ নিরুপদ্রব করে তোলার তাগিদ অনুভব করেন সর্বস্তরের মানুষ। অবশ্য ব্যতিক্রম পাকিস্তানি ভাবাদর্শে দীক্ষিত গোষ্ঠী। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিক্রিয়া স্বাধীন বাসভূমির পক্ষে বলেই কৃষকের সংকল্প রূপায়িত হয় আঞ্চলিক ভাষার কাব্যপঙ্‌ক্তিতে: ‘লাঙল ফেলিয়া বাহে এই হাতে অস্ত্র নিছিলাম ঘরের বাহির হওয়া ঝাঁপ দেই অকূল গাঙেতে।’

স্বাধীনতাযুদ্ধ (১৯৭১) এভাবে বাঙালি জীবনের ঘরে-বাইরে সমান তাৎপর্যে প্রবেশ করে। অকূল গাঙে ঝাঁপ দেওয়া মানুষ সবাই কি তীরে উঠতে পারে? কেউ পারে, কেউ পারে না; যেমন যুদ্ধে, তেমনি ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মিছিলে, তেমনি ঘরবন্দী অবস্থায়ও। এ পারা না–পারার ছবি যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার পাশাপাশি আঁকা হয়েছে কবিতায়, গল্প-উপন্যাস-নাটকে, যেমন যুদ্ধকালে তেমনি যুদ্ধোত্তর সময়ে। তাই যুদ্ধ শেষের পঙ্‌ক্তিমালায় তরুণ কবির বিষণ্ন উচ্চারণ:

‘ছোট ভাইটিকে আমি কোথাও দেখি না
নরোম নোলকপরা বোনটিকে আজ আর কোথাও দেখি না
কেবল পতাকা দেখি
স্বাধীনতা দেখি।’

এমন রক্তঝরা দুঃসহ বেদনার বিস্তর নেপথ্য ঘটনা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি জাতির সংগ্রাম, বিজয় আর ভালোবাসার চালচিত্র রচনার তাগিদে কবির মনে হয়েছে এসবই ‘রূপোকথা হয়ে বেঁচে থাকবে, পৃথিবীর অনেক প্রাচীন রূপোকথার মতো।’ কবিতার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসেও ওই ‘রূপোকথা’ রচনার প্রয়াস বাংলাদেশি সাহিত্যের বিশেষ দিক।

আহমদ রফিক

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0