বিপন্ন বিস্ময় ও খণ্ডিত সত্তার পুনরুত্থান

Aug 12, 2026 - 02:08
 0  1

কল্যাণী রমার উপন্যাসিকা (কিংবা বড় গল্প) বাইপোলার টিয়ারস: সূর্যাস্তের আলো কেবল একটি ক্লিনিক্যাল কেস স্টাডি বা প্রবাসজীবনের আখ্যান নয়; এটি মূলত মানুষের অবচেতনের অতলান্ত গহ্বর, অস্তিত্ববাদী সংকট এবং সেখান থেকে কবিতার মতো জেগে ওঠার এক পরম বেদনার্ত দলিল। খড়গপুর আইআইটি থেকে প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক এবং আমেরিকার উইস্কনসিনে দুই দশকের বেশি সময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত লেখিকার এই সৃষ্টিতে জড়িয়ে আছে এক গভীর মননশীলতা ও কাব্যিক গদ্যের মেলবন্ধন। এই গ্রন্থ বাংলা মনস্তত্ত্ববিষয়ক সাহিত্যকে এক অবর্ণনীয় উচ্চমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

‘মানুষের জীবনের একমাত্র ম্যাজিক হলো—মানুষ আঁধারেও বাঁচে’—গ্রন্থের এই প্রারম্ভিক দর্শনই পুরো কাহিনির মেরুদণ্ড। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আনন্দ যুক্তরাষ্ট্রের উইস্কনসিনের বরফমোড়া ধূসরতায় একাকী বসবাসকারী এক বাঙালি নারী, যিনি ‘বাইপোলার ডিজঅর্ডার ওয়ান’-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। ২০২৪-২৫ সালের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি, তীব্র অবসাদের কালরাত্রিতে আনন্দ জীবনাবসানের ভয়ানক এক খেলায় মেতে ওঠেন। হালকা গোলাপি, নীল, হলুদ আর সাদা রঙের ওষুধগুলোকে স্প্যানিশ জাহাজের ডুবে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রার মতো পরম মমতায় জমিয়েছিলেন তিনি। সেই রঙিন বড়িগুলো গলাধঃকরণের পর, অবচেতনের শেষ প্রান্তে মানুষের আদিমতম জিজীবিষা থেকে তিনি প্রাক্তন স্বামী সূর্যকে ফোন করেন। ৯১১-এর সাইরেন, ফায়ার সার্ভিস এবং প্যারামেডিকসের তৎপরতায় হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, মুখ দিয়ে ফেনা ওঠা আনন্দ মৃত্যুর ঠিক আগে উদ্ধার লাভ করেন

চিত্রাঙ্গদা যেমন সুরূপার ছদ্মবেশে মহাবীর অর্জুনকে প্রেমের বন্ধনে বাঁধতে পেরেও এক গভীর আত্মগ্লানিতে ভুগেছিলেন। কারণ, অর্জুন তাঁর ভেতরের যোদ্ধাকে নয়, কেবল বাহ্যিক রূপকেই ভালোবেসেছিলেন; ঠিক তেমনি আনন্দ যখন ম্যানিক পর্যায়ে থাকেন, তখন তাঁর চারপাশের জৌলুশ ও সৃষ্টিশীলতা প্রশংসিত হলেও, সেটা তাঁর আসল সত্তা নয়।

২.

হাসপাতালের নিষ্প্রাণ যান্ত্রিকতা—যেমন ভেন্টিলেটর, ব্রিদিং টিউব কিংবা পেসমেকারের কঠিন লড়াই পেরিয়ে আনন্দের মধ্যে জেগে ওঠে এক নতুন জীবন। এরপর সাধারণ ওয়ার্ড থেকে সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডের কড়া নজরদারিতে তার অন্তরে যে গভীর ভাঙা-গড়ার ঘটনা ঘটে, লেখিকার লেখনীতে তা ধরা দিয়েছে এক পরম যত্নে। শেষ পর্যন্ত এক লড়াকু মনের মনস্তাত্ত্বিক দলিল হয়ে উঠেছে এই বিবরণ।

বাইপোলার ডিজঅর্ডারের দুটি মেরু—ম্যানিয়া ও ডিপ্রেশন—আনন্দের জীবনে এক তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে।

ক. ম্যানিক পর্যায়: এই অবস্থায় আনন্দের মনে হতো, তিনি এক মহাজাগতিক শক্তির অধিকারী, চারদিকে হীরা ছড়িয়ে দিতে পারেন তিনি। এই উদ্দীপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটত তাঁর রন্ধনশিল্পে আর বাগানে। নানা ধরনের পশ্চিমা পদ থেকে শুরু করে ইলিশ পোলাওয়ে তিনি টেবিল সাজাতে পারতেন। উইস্কনসিনের বুকে গড়ে তুলেছিলেন এক ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান, যেখানে নানা জাতের পশ্চিমা ফুলের পাশাপাশি ফুটে থাকত বাংলাদেশের স্মৃতিজড়ানো লাল-সাদা শাপলা।

খ. ডিপ্রেশন পর্যায়: ম্যানিক পর্যায়ের রঙিন মায়া স্থায়ী হয় না। তারপর আসে অন্ধকারের তীব্র সুনামি। টানা তিন মাস কেবল দুধ-সিরিয়াল খেয়ে বেঁচে থাকা, বিছানা ছাড়তে না পারা এবং নিজের ভেতর তীব্র মৃত্যুকামনাকে লালন করা মনস্তাত্ত্বিক পতন পাঠককে এক অব্যাখ্যেয় বিষণ্নতায় নিমজ্জিত করে।

৩.

মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে, কল্যাণী রমার ‘আনন্দ’ চরিত্রটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’ চরিত্রের এক গভীর ও অন্তর্নিহিত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। উভয় চরিত্রই মূলত মানুষের খণ্ডিত সত্তা এবং প্রকৃত সত্তার মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বের প্রতীক।

চিত্রাঙ্গদা যেমন সুরূপার ছদ্মবেশে মহাবীর অর্জুনকে প্রেমের বন্ধনে বাঁধতে পেরেও এক গভীর আত্মগ্লানিতে ভুগেছিলেন। কারণ, অর্জুন তাঁর ভেতরের যোদ্ধাকে নয়, কেবল বাহ্যিক রূপকেই ভালোবেসেছিলেন; ঠিক তেমনি আনন্দ যখন ম্যানিক পর্যায়ে থাকেন, তখন তাঁর চারপাশের জৌলুশ ও সৃষ্টিশীলতা প্রশংসিত হলেও, সেটা তাঁর আসল সত্তা নয়। ফ্রন্টাল লোবের কোষ বিনষ্ট হওয়া, বাংলা বানান ভুলে যাওয়া আনন্দ যখন হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডের সহযাত্রীদের ক্ষতের মধ্যে নিজেকে দর্পণের মতো দেখেন, তখনই তাঁর প্রকৃত উপলব্ধি ঘটে। চিত্রাঙ্গদার মতোই আনন্দও শেষ পর্যন্ত কোনো কৃত্রিম বিভ্রম বা ছদ্মরূপ চাননি। তিনি চেয়েছেন, তাঁর ক্ষতচিহ্নসহ, তাঁর সমস্ত খণ্ডতাসহ জীবন তাঁকে গ্রহণ করুক। কল্যাণী রমার এ বই এখানে দুর্দান্ত রকম সফল।

হাসপাতালের জানালা দিয়ে লেকের ওপর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আনন্দ বুঝতে পারেন, রোগ লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। মানুষ টাইফয়েড নিয়ে লজ্জিত হয় না, তাহলে মানসিক ব্যাধি নিয়ে কেন হবে? নিজের দুই মেয়ে এলা ও খেলা এবং কুকুর ক্রোকাসের প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা, সেটাই তাঁকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনে।

৪.

কল্যাণী রমার একটি অনন্য সম্পদ হলো তাঁর সাহিত্যিক ঋদ্ধতা। আনন্দের মানসিক ভাঙনকে প্রকাশ করতে লেখিকা টি এস এলিয়টের ‘দ্য লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক’-এর ল্যাজারাসের অনুষঙ্গ এনেছেন, যে মৃতলোক থেকে ফিরে এসে সব বলতে চায়।

আইসিইউয়ের বিছানায় শুয়ে আনন্দের দেখা পরাবাস্তব হ্যালুসিনেশন, যেমন হাসপাতালের ছাদ থেকে লাশ ঝুলে থাকা, ঘরময় কাচের পাখার হাজার হাজার জলফড়িং উড়ে বেড়ানো, কিংবা পুরুষ নার্সের ডার্ট গেমের ফাঁদ; যেন কবি সিলভিয়া প্লাথের ‘প্যারালিটিক’ বা পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘ব্রেন ড্যামেজ’ গানের সেই অমোঘ লাইনের প্রতিধ্বনি। জীবনানন্দ দাশের ‘বিপন্ন বিস্ময়’ কিংবা বুদ্ধদেব গুহের ‘হলুদ বসন্ত’–এর যে সুর এই গল্পের বইতে থাকে, তা কাহিনিকে এক জাদুকরি বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে।

হাসপাতালের জানালা দিয়ে লেকের ওপর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আনন্দ বুঝতে পারেন, রোগ লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। মানুষ টাইফয়েড নিয়ে লজ্জিত হয় না, তাহলে মানসিক ব্যাধি নিয়ে কেন হবে? নিজের দুই মেয়ে এলা ও খেলা এবং কুকুর ক্রোকাসের প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা, সেটাই তাঁকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনে। তিনি নিজের জন্য যে পাঁচটি সুস্থতার খোপ আঁকেন, তা মূলত চিত্রাঙ্গদার সেই আত্মিক পূর্ণতা পাওয়ারই আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর।

প্রথমবার পড়ার পর মনে হয়েছিল, ডায়েরিধর্মী আখ্যান এই গ্রন্থের সাহিত্যিক গভীরতা একটু হলেও কমিয়েছে। পরবর্তী পঠনের পর আমি মত পাল্টাতে বাধ্য হয়েছি। কল্যাণী রমা আনন্দের খণ্ড খণ্ড স্মৃতির কোলাজ, হ্যালুসিনেশন আর জীবনকে ভালোবাসার তীব্র আকুলতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

৫.

উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের সেই অমোঘ পঙ্‌ক্তি ‘বিকজ আ ফায়ার ওয়াজ ইন মাই হেড’ দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটলেও পাঠকহৃদয়ে তা এক গভীর প্রশান্তির আলো রেখে যায়। সূর্যাস্তের আলো যেমন দিনের সমাপ্তির মধ্যেও এক অপরূপ রক্তিম আভা ও আগামী দিনের সম্ভাবনা রেখে যায়, এই গল্পে আনন্দের প্রত্যাবর্তনও ঠিক সেভাবেই মানসিক অবসাদের মেঘ কেটে জাগিয়ে তোলে জীবনের এক জাদুকরি রূপ। বিশ্বমানের মনস্তাত্ত্বিক ও জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যের বোদ্ধা পাঠক-পাঠিকার জন্য কল্যাণী রমার এই অবিস্মরণীয় সৃষ্টি এক পরম পাওয়া।

পুনশ্চ:

১. বাইপোলার টিয়ারস: সূর্যাস্তের আলো কেবল একটি নান্দনিক বড় গল্প নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে প্রচলিত ট্যাবু বা লজ্জার বিরুদ্ধে এক নীরব ও সুতীব্র প্রতিবাদ।

২. প্রবন্ধের মতো বইটির শেষে শব্দকোষ (গ্লসারি) ও তথ্যসূত্র যুক্ত করায় ইনটিউবেশন, ইসোফেগাস, গেট বেল্ট, গ্রুপ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, প্যারামেডিক, ফিজেট টয়, ৯১১-এর মতো আমাদের দেশে আপাত–অপ্রচলিত শব্দগুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য বোঝা সহজ হয়েছে।

৩. প্রথমবার পড়ার পর মনে হয়েছিল, ডায়েরিধর্মী আখ্যান এই গ্রন্থের সাহিত্যিক গভীরতা একটু হলেও কমিয়েছে। পরবর্তী পঠনের পর আমি মত পাল্টাতে বাধ্য হয়েছি। কল্যাণী রমা আনন্দের খণ্ড খণ্ড স্মৃতির কোলাজ, হ্যালুসিনেশন আর জীবনকে ভালোবাসার তীব্র আকুলতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। লেখিকা বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো খণ্ডিত মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলতে সেই সময় এই ফরম্যাটই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছেন; যা প্রকৃতপক্ষে বাহ্যিক কাহিনির চেয়ে আনন্দের ভেতরের ক্ষত ও পুনরুত্থানকে অত্যন্ত নিখুঁত ও সুচারুরূপে উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আমার ধারণা, কল্যাণী রমা এখনো ইচ্ছা করলে একে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে রূপ দিতে পারেন। এই কাহিনিতে উপন্যাসের সব কটি উপাদানই বিদ্যমান রয়েছে।

  • বাইপোলার টিয়ারস: সূর্যাস্তের আলো
    কল্যাণী রমা

    সম্পাদনা: ইচক দুয়েন্দে
    প্রকাশক: পেঁচা সম্পাদনা পর্ষদ, রাজশাহী
    প্রকাশ: মে ২০২৫
    প্রচ্ছদ: আসমা উষা
    পৃষ্ঠা: ৭৮; মূল্য: ৩৫০ টাকা

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0